শোকের অপর নাম শাহ আলম - দেবাশীষ দেবু
.jpg)
অকাল প্রয়াত চিত্রশিল্পী শাহ আলম ও তার আঁকা চিত্রকর্ম কবি কাজী নজরুল ইসলাম
ছিলো,
নেই,
ব্যস এই।
কার কবিতা এটা? জয় গোস্বামীর? হবে হয়তো। কোথায় যেনো পড়েছি। কিংবা হতে পারে কোথাও পড়িনি আসলে শুনেছি কারো মুখে। আলম ভাই মারা যাওয়ার পর কেনো যেনো এই লাইনগুলো মনে পড়ছিলো। আলম ভাই মানে শাহ আলম। চিত্রশিল্পী শাহ আলম।
২০০৬ সালে ২৯ মে মধ্যরাতে মারা যান শাহ আলম। চার বছর চলে গেলো। অথচ সদ্য নগর হয়ে ওঠা এই সাবেক শহরে এখনো কী তীব্রভাবেই বেঁচে আছেন তিনি। বেঁচে আছেন তাঁর চিত্রকর্মের মাঝে। তবে সবচেয়ে প্রবলভাবে বেঁচেন আছেন সম্ভবত তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে। এখনো সিলেটে কোন নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হলে শারিরীক অনুপস্থিতি সত্বেত্ত সবার আগে এসে হাজির হন শাহ আলম। এখনো যে কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা সবার আগে উপলব্দি করেন শাহ আলমের অভাববোধ।
এই শহরে শাহ আলম থেকে হয়তো আরো অনেক বড় চিত্রশিল্পী আছেন, হয়তো আরো প্রবীণ, আরো প্রাতিনাষ্টানিক শিক্ষায় শিক্ষিত, আরো নামকরা চিত্রশিল্পীরা আছেন, ছিলেন, আসবেন; তবে শাহ আলমের মতো করে কেউ এই শহরের একটা প্রজন্মকে স্বাপ্নিক আর চিত্রশিল্পের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারেন নি। এখনকার তরুণদের তিনি এই স্বপ্নটা দেখাতে পেরেছেন যে, আঁকাআঁকি নিয়েও বেঁচে থাকা যায়। এখানেই শাহ আলম অনন্য, অনস্বীকার্য। ফলে এই শহরে এখন যেসব তরুণ-তরুণীরা আঁকাআঁকি করে, যারা চিত্রশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের কাছে শাহ আলম হয়ে উঠেছেন রোল মডেল। হয়ে উঠেছেন অনুকরনীয়, অনুস্মরনীয়জন। মাত্র তেত্রিশ বছরে একটা জীবনে এর চেয়ে বেশী আর কী চাওয়ার থাকতে পারে মানুষের!
এই তো ক’দিন আগেই শাহ আলম’র আজন্ম স্বপ্ন তাঁর একক চিত্রপ্রদর্শনী হলো। দেশ বরেণ্য চিত্রশিল্পীরা ঘুরে দেখলেন সে প্রদর্শনী। চিত্রকর্ম নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করলেন। আলম ভাইয়ের নামে আর্ট গ্যালারি স্থাপিত হলো সিলেটে। অনেক কিছু হচ্ছে। আরো অনেক কিছু হওয়ার কথা ছিলো। আরো অনেক কিছু হবে হয়তো। কেবল শাহ আলমই বেঁচে থাকতে এসব কিছু দেখে যেতে পারলেন না। বেঁচে থাকতে তারকাকেও উপেক্ষা আর মরে গেলে জোনাকী পোকাকেও তারকা বানিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি আমাদের সমাজে প্রায় প্রতিষ্টিত হয়ে উঠেছে সেই ধারা থেকে শাহ আলমও রেহাই পেলেন না। ফলে বেঁচে থাকাকালীন সময়ে অনেক চেষ্টা সত্তে¡ও নিজের একক চিত্রপ্রর্দশনীটা করতে পারলেন না তিনি। তারপরও তো হলো শাহ আলমেরই উত্তরসূরী কিছু তরুণ সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের উপর দায় হয়ে চেপে থাকা এই প্রদর্শণীটার আয়োজন করলো।
এবার শাহ আলমের মৃত্যুবার্ষিকীতে ম্যাগাজিন ও ডকুমেন্টারী করার পরিকল্পনা নিয়েছে হিমন, আলী দেলোয়ার, দেলওয়ার ও বেলালরা। আমি ভাবি, শিল্পীর আবার মৃত্যুবার্ষিকী কী? শিল্পী তো সদা জাগ্রত। সবস সময়ই জীবিত। তারপরও হিমনরা ক্ষান্ত হয় না।
নাজিম হিকমত লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোড় একবছর। এখন একবিংশ শতাব্দি। একবিংশ শতাব্দিতে মানুষের শোকের আয়ু কতদিন? নাজিম হিকমত বেঁচে থাকলে বলতে পারতেন হয়তো। আমাদের অবশ্য তা জানার দরকার নেই। কারন আমরা এই শতাব্দিতে মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব যতই বন্দী হয়ে পড়ি না কেন, এই শতাব্দিতে এসে প্রেমের বাতাস অপেক্ষা পুঁজির বাতাস যতই ভয়ংকর হয়ে উঠুক না কেন আমরা তো জানি, শাহ আলম, মৃত্যুর চার বছর পরও আমাদের কাছে এক দুঃখজাগানিয়া নাম। কিংবা বলা যেতে পারে শোকের অপর নাম শাহ আলম।
.jpg)
শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং
মৃত্যুর চার বছর পর এলিজি লেখার কোন মানে হয় না। একজন চিত্রশিল্পীকে নিয়ে লিখতে হলে, চিত্রশিল্পীকে ফুটিয়ে তুলতে হলে তাঁর চিত্রকর্মের ফিরে যাওয়াই বাঞ্চনীয়। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন ‘কবিরে পাবে না তুমি জীবনচরিতে।’ তেমনি চিত্রশিল্পীকে তাঁর জীবনযাপনে আর কতটুকুই বা পাওয়া যায়? কিন্তু চিত্রকর্ম নিয়ে লিখতে আমি নেহায়েতই অপরাগ। অক্ষমতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।
ইদানীং একটা প্রবণতা খুব লক্ষ্য করা যায়। কোন প্রয়াত ব্যাক্তিকে নিয়ে লিখতে হলে ওই ব্যাক্তিটির সাথে লেখকের কি সম্পর্ক ছিলো, প্রয়াত ব্যাক্তিটি লেখকের দিকে তাকিয়ে কবে একবার মুচকি হেসেছিলেন, কবে একটু ভালোমন্দ জিজ্ঞিাসা করেছিলেন তাই তুলে ধরা হয় লেখায়। তাতে যাকে নিয়ে লেখা তাঁর চেয়ে যিনি লিখছেন তিনিই ফুটে উঠেন বেশি। এসব লেখায় লেখক নিজেকেই জাহির করে থাকেন সচেতনভাবে। প্রচণ্ড অনীহা সত্তে¡ও আমাকেও হয়তো এই লেখাই তাই করতে হলো। তার এক নম্বর কারন চিত্রশিল্প সম্পর্কে অজ্ঞতা আর দুই নম্বর কারন হিমন, বেলালদের নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকা। তবে সবচেয়ে বড় কারন বোধহয় শাহ আলম ভাই প্রতি দায়গ্রস্ততা। এই ধর্মান্ধ মৌলবাদ আচ্ছন্ন শহরে শাহ আলম ছিলেন এক সরব প্রতিবাদ। যে শহরে কোন ভাস্কর্য নেই, মুক্তিযুদ্ধের কোন স্মৃতিস্তম্ভ নেই, যে শহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটিকও প্রতিষ্ঠা করতে হয় রাতের আঁধারে, মৌলবাদীদের চোখ এড়িয়ে সে শহরে এসব কুপমুণ্ডকতা আর প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদের নাম শাহ আলম। এই শহরের একজন সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে তাই তাঁর প্রতি ঋণবোধ আপনাতেই জন্মে যায়।
দেবাশীষ দেবু
সংবাদিক
লেখাটি ২৯ মে ২০১০ সালে যুগভেরী পত্রিকার বিষেশ সংখ্যার থেকে নেয়া।