শাহ আলম ।। নিজামউদ্দিন লস্কর
ঘনিষ্ঠ সম্পকর্ ছিল আমার শাহ আলমের সাথে। আজও আছে। “ছিল” মানে অতীত। সাঁকোর নিচের জলের মতো, বয়ে চলে যায়, ফিরে আসেনা। সাঁকোর নিচের জলের মতো শাহ আলম এসে বয়ে চলে গেছে। সম্মিলিত নাট্য পরিষদের কোন এক উৎসবে বেশ কয়েক বছর আগে তার সাথে পরিচয় আমার। উৎসবের ব্যানার, ফস্টুন, লগো, যাবতীয় আর্টের কাজ সে করেছিল। বয়সে প্রায় আমার অর্ধেক হলেও সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হতে কোন অসুবিধা হয়নি দুজনের। শিল্পকলাতে আমি যেতাম নাটকের ক্লাস নিতে সে চারুকলার। ঠোঁটের প্রান্ত দেশে একফালি হাসি লেগেই থাকতো। দেখা হলেই উপহার পেত সবাই তার কাছে থেকে এই হাসিটি। ২০০০ সালের মিলেনিয়াম উৎসবে ৩১ শে ডিসেম্বর রেজিস্ট্রেশন ক্লাবের পক্ষ থেকে বেশ জাঁকজমকপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ফোন পাবার সাথে সাথে ছুটে এল বাসায়। উঠলাম পরিকল্পনা শুনে লাফিয়ে উঠলো আনন্দে। বড় কাজে নিজেকে বেশি করে খুলে ধরতে পারতো। জানতে চাইলো আমি কিভাবে চাই। সবসময় আমার মতামতের উপর ভিত্তি করে তার ডিজাইন দাঁড় করাতে এবং প্রথমবার এই কাংখিত নকশাটি পেয়ে যেতাম আমি। অনুষ্ঠানে সেবার মিলেনিয়াম অনুষ্ঠানে হাজার বছরের বিশ্ব সংস্কৃতিকে তার শিল্পকর্ম এমন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল, অনুষ্ঠান দেখে তে এসে এমন কোন দর্শক নেই আমার কাছে জানতে চাইনি শিল্পীর পরিচয়। বাইরে থেকে বেড়াতে যারা আসছেন তারা জানতে চাইতেন কাজটি করেছে? বর্তমান উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আমাকে বলেছিলেন এর কাজ ও সিলেটে হয় (২০০৭) অনেকদিন সেটাকে আমার ক্লাবে সংরক্ষণ করেছিলাম। আমার রচনা ও নির্দেশ মতে একটি গীতি নৃত্য- নাট্য মঞ্চস্থ হয়েছিল ষ্টেশন ক্লাব। নাম পালকি জি তিনমাস পরে আবার মঞ্চস্থ হয় সেটা । শত বছরের ঐতিহ্য লালিত ক্লাবের ইতিহাসে এর আগে কোন অনুষ্ঠানের পুনরাবৃত্তি ঘটে নি। সেই নাটকের সেট নির্মাণ ও মঞ্চ পরিকল্পনা সে করেছিল দ্বিতীয়বারের অনুষ্ঠানে ঢাকা ক্লাবের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী ছিলেন প্রধান অতিথি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন গীতি আরা চৌধুরী তার কাজ দেখে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শাহ আলমকে তাঁর সাথে । বিশাল একটি মঞ্চ পরিকল্পনার ভার পড়ল একবার আমার কাঁধে। তাকে ডাক দিতেই ছুটে এল। আমি তাকে একটা ডিজাইন দাঁড় করানোর কথা বলতেই চিরাচরিত মুচকি হেসে বলল, আগে আপনার ভাবনাটি বলুন আমাকে, তারপর দুজনে মিলে দাঁড় করাব। আমি আঁকতে পারিনা। মোটামুটি একটি স্কেচ করে দেখাতেই বুঝে ফেলল সে । সাথে সাথে সাদা কাগজে তারটা দাঁড় করাল। আমি বললাম একাই করব। দুদিন পর নিয়ে এল মূল নকশা। বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম চুড়ান্ত নকশা দেখে। মাদ্রাসা মাঠে বিশাল এই মঞ্চ তৈরি করতে উপকরন ও আনুষাঙ্গিক নির্মাণ ব্যয় বাবদ প্রচুর টাকা খরচের কথা ভেবে ভয়ে ভয়ে বলল, লাভের কোনো দরকার নেই আমার, কাজটি করতে পারলেই খুশি আমি, এতবড় কাজ সিলেটে সব সময় হয় না, দেখুন চেষ্টা করে করা যায় কি না? আমিও অনেকটা বিব্রত ভাব নিয়ে নকশাটি দেখালাম আয়োজকদের। কাজটি সে করেছিল, মাদ্রাসা মাঠে শেখ হাসিনাসহ ওই জনসভাতে যারা সেদিন এসেছিলেন সবাই কিন্তু জানতে চেয়েছিলেন নকশাটি কে করেছে?
ফুল পেয়ে সন্তুষ্ট না হয়ে মানুষ গাছ দেখতে চায়, এমন ভাগ্য খুব কম শিল্পীর কপালে এভাবে জোটতে দেখেছি আমি।
2.jpg)
জীবনের উদ্দেশ্য হল, উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন। একজন আলোকিত মানুষ জানে জীবন থেকে কী পেতে চায় সে। সুনিদিষ্টি লক্ষ্যে ছিল তার জীবন। পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছিল সে লক্ষ্যের দিক। দুঃসাহসিক একটি বিশেষ দায়িত্ব কাঁধেদিয়ে পাঠানো হয়েছে পৃথিবীতে আমাদের। জীবনের কার্যক্রমকে যথাযতভাবে উপলদ্ধি করার জন্য আমাদের সকলকে অনন্য প্রতিভা ও গুণাবলি প্রদান করা হয়েছে। দুভাগ্যবশত গুণাবলি ও অনন্য প্রতিভার চাবিকাঠিকে আবিস্কারের কষ্ট স্বীকার সাধারণ মানুষেরা করে না। যে করে সাধারণ থেকে অসাধারণে পরিণত হয় সে। শাহ আলম আবিস্কার করেছিল কেন েএসেছে সে পৃথিবীতে। একশো বছরের জীবন আমার কাছে শুধু একটা মোমবাতি নয়। চমৎকার একটি মশালের মতো। এই মুহূর্তে আমি ধরে রেখেছি এবং একটাকে জ্বালিয়ে রাখতে চাই যতটুকু সম্ভব উজ্জ্বলতার সাথে, ভবিষ্যৎ প্রজম্নের কাছে হস্তান্তরের আগে । শুরুতে লিখেছিলাম, শাহ আলমের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আজও আছে। সবসময় মনে পড়েনা তাকে। আগেও পড়ত না। শুধু প্রয়োজনেই মনে পড়ত। আজ পর্যন্ত কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। বেশ কিছু দিন আগে বিশেষ একটি কাজ এসে পড়ল আমার ঘাড়ে। মনে পড়ল তাকে। সে ছাড়া আমার মনের মতো কেউ করতে পারবে না কাজটি, এ ব্যপারে কোন সন্দেহ ছিলনা। সে-ই যেন চুপিসারে বলেদিল সমাধান। ফোন করলাম তার গুরু অরবিন্দ বাবুর কাছে। দাদা বললেন, একটা ছেলে আছে নাম ইমন, শাহ আলমের ছাত্র, আপনার ভালো লাগবে পাঠাচ্ছি আপনার কাছে। ঘন্টাখানেক পরে এল এক তরুণ। প্রথম যখন শাহ আলমের সাথে পরিচয় হয়েছিল ঠিক ওই সময়ে তার সে বয়স ছিল, এই ছেলেটার বয়সও ঠিক তাই। পরিচয় দিতে গিয়ে জানাল- অরবিন্দ স্যার পাঠিয়েছেন, আমার নামি আসলে হিমন, সবাই ভূল করে ইমন ডাকেন, তবে শাহ আলম ভাইয়ের ছাত্র আমি, আমি বললাম তোমার স্যারও ভূল নামটাই বলেছেন, তুমি ইমন বা হিমন হও আমার কাছে শাহ আলম। স্বাধীনতা দিবসের ওপর একটা অনুষ্ঠান, মঞ্চ পরিকল্পনা করতে হবে, পারবে নাকি? জিজ্ঞেস করলাম। স্যার আপনি চাইছেন কেমন একটু ধারনা দিলে নকশা এঁকে নিয়ে আসতাম আপনার কাছে। আবার শাহ আলম। আমার ধারনা মতো করে এঁকে দিলাম। বিকেলে নিয়ে এল চুড়ান্ত নকশা। চুড়ান্ত নকশায় চুড়ান্ত শাহ আলমকে খঁজে পেলাম আবার। এভাবে একর পর এক অনুষ্ঠান করে যাচ্ছি আজও, এই তো গত তিন সপ্তাহ আগেও একটি কাজ করেছি ইমন,হিমন আর শাহ আলমকে নিয়ে। আগে ছিল একা শাহ আলম, এখন ওরা তিনজন।
.jpg)
২০০৬ সালের মে মাসের ২৯ তারিখে মধ্যরাত অতিক্রম করার পর অর্থাৎ ৩০শে মে শাহ আলমের মৃত্যুর পর অরেকে ভাবলেন সে আর নেই। সাঁকোর নিচের জলের মতো অতীত, প্রবাহিত হয়ে মিশে গেছে অনন্তকালের স্রোতধারার সাথে।
৯জুন ২০০৬ বিকাল ৪টায় সিলেট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সিলেট প্রতিদিন পরিবার ও সিলেট নজরুল পরিষদের উদ্যোগে শাহ আলমের অসমাপ্ত কাজ আর স্বপ্নকে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে েএকটি শোকসভা আয়োজন করা হয়। আলেচনা অনেক হয় সেখানে। পরে আবার সিলেট প্রতিদিনের অফিসে বসে আমরা তার সম্পর্কে অনেক কিছু করার কথা বলেছি ও ভেবেছি, করা কতটুকু সম্ভব হয়েছে জানা নেই আমার। তবে ব্যারিস্টার আরশ আলি সাহেব ১০০০ টাকা দিয়েছিলেন, পরে আমিও ১০০০ টাকা দিয়েছিলাম। প্রেস ক্লাব বিবিসির স্রোতা জরিপে নির্ব াচিত শ্রেষ্ঠ বিশটি গানের আলোচনা অনুষ্ঠানে মরহুম হাবিবুর রহমান স্যারের সাথে দেখা হয়ে আমার। পরের দিনই স্যারের ঢাকায় যাবার প্রোগ্রাম থাকাতে স্যার আমার কাছে ১০০০ টাকা দিয়ে বলেছিলেন ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ কাছে শাহ আলমের তহবিলে জমা দিতে। বলেছিলেন আরও লাগলে পরে তিনি আরও দেবেন।স্যার খুব ভালোবাসতেন তাকে। এ ব্যবারে একটুকুর বেশি আর আমার জানা নেই। আমরা শাহ আলমের অসমাপ্ত কাজ ও তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে না পারলেও সে থেমে নেই। সে করছেই এবং সাফল্যের সাথেই করছে অব্যাহত গতিতে করেই চলছেআজও, আশ্চর্যজনকভাবে। কিন্তু আমার সকল ধারনা পাল্টে দিয়ে আবার এসে হাজির হল। ২০০৬ সালের ২০শে অক্টোবর ঈদ সংখ্যা “অভিমত” এর পাতায় খুলতেই দেখি প্রচ্ছদ ও ভেতরের সবকটি অলংকরন শিল্পী শাহ আলম। আমারও একটি ছোট গল্প ছাপা হয়েছে সংখ্যাটিতে। গল্পের নাম “উপহার”। গল্প অনুযায়ী অলংকরন একশোভাগ আমার মন মতো হয়েছে। শাহ আলমকেও পরতে পরতে পাওয়া যাচ্ছে। গোলমালটা আমার মাথায় না পত্রিকাওয়ালাদের আন্দাজ করতে না পেরে অভিমতের মুক্তাকে ফোন করে জিঞ্জাসা করলাস, প্রচ্ছদ শিল্পী কে? উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল মুক্তা আমাকে সাথে সাথে। কেন শাহ আলমের নাম নেই? আমি বললাম কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব। মুক্তা জানাল- অনেকগুলো কাজ সে আগে থেকেই করে রেখেছিল অভিমতের জন্য। সব কম্পিউটারে সংরক্ষিত আছে। তাই ব্যবহার করা হয়েছে, এবং আজও বহু জায়গাতে ব্যবহার করা হচ্ছে এইমাত্র জানালেন কবি শুভেন্দু ইমাম আমাকে। তিন মাস আগে তারই বয়সী এক বন্ধু এসেছিল আমার কাছে। শাহ আলমের ওপরে একটা লেখা দিতে হবে। এরপর বহুবার এসছে তার বন্ধুটি আর প্রতিবারই দু একদিনের মধ্যে দিয়ে দেব বলে তাকে বিদায় করেছি। চেষ্টা করেও লিখতে বসা হয়নি, কথা রাখাও হয়নি। হাতে েএকটা কাজ ছিল একুশে বই মেলাতে ছাপা হবার কথাও ছিল, কিন্তু শেষ করতে না পারায় শাহ আলমকে নিয়ে কিছুই লিখা হয়নি। তাড়াহুড়া করে দায়সারা গোছের কিছু একটা লিখে দায়মুক্ত হবার কথা ভাবতেও পারিনা। কারণ তাকে ছাড়া আমার আগেও যেমন চলত না, আজও চলে না। লেখকদের মতো লেখার সহজাত গুনাবলির ছিটেফোঁটা আমার মধ্যে নেই। গত পরষু অরবিন্দ দা ফোন করে বলেছেন, দাদা শাহ আলমের ওপর আপনার লেখার খবর কী? কথা দিয়েছি দু’ তিন দিনের ভেতরেই শেষ করে পাঠিয়ে দেব। েএখন দেখছি ওকে নিয়ে লেখা আমার কোনদিনও শেষ হবে না। নতুন নতুন কাজ এসে জমা পড়বে, তাকে নিয়ে নতুন নতুন কথার জন্ম হবে, জন্ম হবে নতুন লেখার , এখাবেই চলতে থাকবে অনন্তকাল। গতকাল শেষ হয়েছে আমার হাতের কাজ। আজ লিখতে বসেচি শাহ আলমকে নিয়ে। স্থির করেছি অসমাপ্ত লেখাটাই জমা দেব তার নামে। টেলিফোনের রিং হচ্ছে বেড রুমে, বিয়েতে গেছে বাসার সবাই, বিরক্ত হয়ে উঠে গিয়ে ফোন ধরলাম। ওপাশ থেকে ভায়রা বললেন, মে মাসের ১২ তারিখে তার একমাত্র মেয়ের বিয়ে, খুব ধুমধাম করে বিয়েটা দিতে চান সেটাও জানালেন। গায়ে হলুদের জন্য একটি প্যান্ডেল ও স্টেজ সাজাতে হবে যেন আমেরিকা থেকে আসা পরমাত্মীয়দের কাছে তার মুখটা অন্ধকার না হয়।
অতেএব শাহ আলম সম্পর্কে আজ আর লেখার সময় আমার হাতে নেই। হিমন কে ফোন করে বলতে হবে শাহ আলমকে দরকার আমার।
নিজামউদ্দিন লস্কর
মুক্তিযোদ্ধা, লেখক, নাট্যকার, নাট্যশিল্পী ।। ২০০৭ সালে শাহ আলম স্মারক গ্রন্থ “মোরলাগি করিয়োনা শোক” থেকে নেয়া।