Image

শাহ্ আলমের শিল্পচৈতন্য - অরবিন্দ দাসগুপ্ত

কথা ছিলো শাহ্  আলমের শিল্পকর্ম নিয়ে ব্যাপক পরিসরে মূল্যায়ন সাপেক্ষে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লিখবো। এরকমই একটি প্রতিশ্রুতি ছিলো তার অকাল প্রয়াণে পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত স্মৃতিধর্মী একটি নিবন্ধে। শাহ্ আলমের শিল্পচৈতন্য সম্মন্ধে লিখতে গিয়ে একটি প্রশ্নই মনে ঊঁকি দিচ্ছে যে তার শৈল্পিক মূল্যায়নের প্রকৃত যোগ্যতা  কি আমার আছে? তবু এই ভেবে লিখতে সাহস পাচ্ছি যে আমি শুরু করলে কেউ না কেউ এ অপূর্ণতার গ্লানি মুছে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করবেন শাহ্ আলমের পরিপূর্ণ শৈল্পিক প্রতিকৃতি ও চরিত্রকে।

অকাল প্রয়াত ঊনত্রিশোর্ধ এক তরুণ চিত্রশিল্পির নাম শাহ্ আলম। শাহ্ আলম কেমন শিল্পি, কার শিল্পি ? এককথায় কোন জবাব হয়না। শাহ্ আলমকে বুঝতে হলে জানতে হবে জীবন ও প্রকৃতি প্রসূত তার মন এবং মননের দৃষ্টিভঙ্গি, রঙ-রেখার প্রতি নিবেদিত চৈতন্যের আবেগ ও আলোকিত সংবেদনশীল ব্যাক্তিত্বের পরিকাঠামোকে। 

চিত্রশিল্পী শাহ আলমের শেষ স্থিরচিত্র। ২৫ মে ২০০৬

 

ক্ষণজন্মা শাহ্ আলম বিশ্ব চারুশিল্পের বিশাল পরিক্রমায় হয়ত: অতুলনীয় কোন শিল্প ব্যক্তিত্ব নয় তবে বিশিষ্টজনের কাতারে দাড়াবার শক্তি ও সামর্থ তার ছিল। তার ছিলো অনুশীলন এবং পর্যবেক্ষণ জ্ঞানের পারস্পরিক সমন্বয় কিন্তু অকালে ঝরে গেলো একটি বিকাশমুখি চিরসবুজ গোলাপ- নিয়তিই তাকে চিরদিনের জন্য তুলে নিয়ে গেলো সৃজনশীল মাতৃক্রোড় হতে-একেই বলে নিয়তির পরিহাস!

শাহ্ আলমের শিল্পচৈতন্যে গ্রামীন প্রকৃতি, শ্রমজীবি, খেটে খাওয়া অবহেলিত মানুষেরা দৃশ্যমান হয় এমন কী নতুন আঙ্গিকগত ভঙ্গিতে- ইঙ্গিতে যা সীমাবদ্ব ধর্মীয় গন্ডীর উর্ধ্বে সামাজিক পটবিন্যাসে, মানবিক, সহমর্মিতার বাতাবরণে যা এদেশীয় চিত্রকলার স্থানীয় পটভূমিতে অভূতপূর্ব।

শাহ্ আলমকে যদি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি তাহলে আমরা দেখতে পাবো এক সহজাত প্রক্রিয়ায় সে অর্জন করেছিলো এক অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতা। পারিবারিক উৎসে কিংবা তার বেড়ে উঠার সামাজিক পরিবেশে সৃজনশীলতার কোন পরিপ্রেক্ষিত না থাকায় একে জাদুকরী বিস্ময়ই বলতে হয়। শুধু ড্রইং এর পারঙ্গমতাই নয়, লক্ষনীয় যে বাল্য ও কৈশোরকাল থেকেই জীবন ও প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে অনুধাবনের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলো শাহ্ আলম। জীবনের প্রতি গাঢ় মমত্ববোধ বিশেষ করে অবহেলিত শ্রমজীবি জনগোষ্ঠির প্রতি  সহানুভূতি ও সহমর্মিতা সর্বোপরি সত্য-সুন্দরের প্রতি নিষ্ঠা ও আনুগত্য শাহ্ আলমকে এক অনন্য মাত্রাসম্পন্ন মানুষে পরিণত করে। এ থেকে জন্ম নেয়  দেশমাতৃকার প্রতি তার দায়বোধ যা ব্যক্তিস্বার্থের উর্ধে ত্যাগের মহিমায় সিক্ত। পশ্চাদপদ জনগোষ্ঠীর মধ্যে চারুশিল্পের সম্প্রসারণে নিজেকে উৎসর্গ করার মানসিকতা তাকে সমাজে মহিমান্বিত করে তোলে যার ফলশ্রুতিতে স্বল্প ব্যবধানে স্থানীয় শিল্পোমোদীদের দৃষ্টি আর্কষণে সক্ষম হয় শাহ্ আলম।

 

নবীন শিল্পিরা প্রথম জীবনে দু’টি পথ খোলা দেখতে পান। প্রথমত নিরুদ্রব মনভোলানো কর্মাশিয়াল পথ, দ্বিতীয়ত অরণ্যসংকুল কন্টকাস্তীর্ণ ক্লাসিক পথ। অধিকাংশ শিল্পিগণ অনুসরণ করেন প্রথম পথটি। বিপদসংকুল অনাবিস্কৃত অরণ্যপথ যে স্বল্প সংখ্যক বেহিসেবী শিল্পিরা সাদরে বরণ করে নেন শাহ্ আলম ছিলো সেই দলের পথিক। তাই তার আমৃত্যু যাত্রাপথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না, ছিলো না দৈনন্দিন ছকবাঁধা গতানুগতিক মডেলে মোড়ানো আয়েশী জীবন অন্বেষা। শাহ্ আলম জানতো শিল্প মানেই জীর্ণ পুরাতনকে ভেঙ্গে নতুন গঠনমূলক রীতিনীতির প্রতিষ্ঠা। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে চারুকলার গতিপ্রকৃতি ও ধ্যানধারণার কাঠামোগত যে সমন্বয় ছিলো যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এতে ধ্বস নামে। নতুন নতুন ইজমগুলির সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটতে থাকে। ইমপ্রেসনিজম, পোষ্ট ইমপ্রেসনিজম, দাদাইজম, স্যুরেলিজম, কিউবিজমের প্রবল তাপ ও চাপে পুরানো ধ্যানধারণার স্থিতিস্থাপকতা অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে। শিল্পিরা গতানুগতিক রিয়েলিজমের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। যুদ্ধের করুণ বাস্তবতা এবং বিশ্বব্যাপি সমাজ কাঠামো পরিবর্তনের ধারা এর জন্য মূলত: দায়ী। দুটি বিশ্ব যুদ্ধের সংহারী ঘুর্ণাবর্তে ইউরোপ ছাড়খার হয়ে যায়। শিল্পকলার নন্দনতত্ত্বে তার প্রভাব ছিল অপরিসীম। প্রখ্যাত শিল্প সমালোচক নিখিল বিশ্বাসের ভাষায় ‘ মামুলি সেকেলে প্রাচীনপন্থি নকলবিশি চিত্রশিল্পিদের প্রকৃতির রূপের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে নব্যতন্ত্রের নৈরূপ্যবাদের চেতনা বিস্তার লাভ করলো। নৈরূপ্যবাদের চেতনার স্বরূপ ও চরিত্র কি? সে চরিত্র ছিল সমাজের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা। এই বিকাশমান অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক লাম্পট্যের অবক্ষয় রোধের দীপ্ত শপথ নিয়ে ব্রাক, সাগাল,অরি রুশো, পিকাসো, সালভাদর ডালি, চিরাকো, মার্ক অন স্বনামধন্য শিল্পিগন বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। একের পর এক সৃষ্টি হতে থাকলো কালজয়ী সব শিল্পকর্ম। গোয়ার্নিকা সৃষ্টি করে পিকাসো জগৎকে তাক লাগিয়ে দিলেন। ইমপ্রেসনিষ্টরা বেছে নিলেন আলো- অন্ধকারের প্রতীকি ব্যাঞ্জনার পথ, কিউবিষ্টরা ছুটলো জ্যামেতিক ফর্মের রাস্তা ধরে। আর স্যুরেলিজম পন্থীরা সমাজের নেতিবাচক চরিত্রকে বের করে এনে আঘাত করলো তার মর্মমূলে। মত ও পথের স্বচ্ছতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ফলে ইজমগুলি ক্রমশ: সমাজ ও রাষ্ট্রে গ্রহনযোগ্যতা পেল। শুধু টিকলো না দাদাইজম। দাদাইজমের সূঁচালো বক্তব্য থাকা সত্তেত্ত্ব ইতিবাচক আদর্শহীনতার জন্য ক্রমশ: তার গ্রহনযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। কালের অতলে দাদাইজম শুধু স্মৃতি হয়েই বেঁচে রইল।

 

স্যুরেলিজম, ইমপ্রেসনিজম, কিউবিজমের প্রকাশভঙ্গি মূলত: দ্বিমাত্রিক। ত্রিমাত্রিক রিয়েলিজমভিত্তিক শিল্পকর্মগুলি মূল বক্তব্যে অনেকসময় খেই হারিয়ে ফেলে, সৌন্দর্যের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে ম্লান হয়ে পড়ে বক্তব্য, শিল্পের ভাষা। ড্রইংকে দ্বিমাত্রিক কর্মে ভেঙ্গে ফেলে আধুনিক শিল্পিরা সাবলীন ভাবে উপস্থাপনা করতে সক্ষম হন তাদের বক্তব্যের প্রতীকি ব্যঞ্জনা।

চারুকলা জগতের সর্বকণিষ্ঠ ইজম এবষ্ট্রাক এক্সপেসনিজমের মৌল কাঠামোর প্রতি আমার ব্যাক্তিগতভাবে কিছু অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ তার নির্মাণ কৌশলের প্রতি নয়- মূলত: মন ও মননের চোরাবালিতে টেনে নিয়ে কৌশলে দ্বন্ধবাদের অন্ধকার কুঠুরীতে ছুঁড়ে ফেলে দেবার যে আঙ্গিক ও রুপকল্প ব্যাবহার করা হয় যা নিরেট ফাকিঁর মায়াজালে চোখকে আষ্টেপৃষ্টে বেধেঁ  রাখে তার উপর। আধুনিক শিল্পের কাঠামোটি বুুদ্ধিবৃত্তির উপর বড়বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এতে অন্তরের ভাব যাচ্ছে শুকিয়ে। শিল্পের স্বাধীনতার নামে অনেক শিল্পিই যে স্বেচ্ছাচারের প্রকাশ ঘটাচ্ছেন, কার্যকারন তত্ত্বের গোলক ধাঁধায় ফেলে পূর্ববর্তী যুগসূত্র অস্বীকার করে আধুনিকতার নামে বিশ্বায়নের দোহাই দিচ্ছেন, নাড়ী ও শিকড় বিচ্ছিন্ন এ ধরণের শিল্পকলা কতদিন তার অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারবে তা এখন দেখার বিষয়। মনে রাখা উচিৎ সাড়া জাগানো দাদাইজম কালের আবর্তে এখন শুধুই স্মৃতি। 

প্রসঙ্গান্তরে অনেকটা পথ চলে এসেছি। এবার মূল বিষয়ে ফিরে যাই। শাহ্ আলম একজন শিল্পি। প্রশ্ন আসতে পারে কেমন শিল্পি? এ ক্ষণজন্মা শিল্পি আপাতমমস্তক একজন সৃজনশীল মানুষ। কী ছিলো শাহ্ আলমের ব্যাক্তিত্বে যা মানুষকে আপ্লুত করতো, করতো আপনজন! অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্থ, সাহচার্যে বিশ্বস্ত, সহমর্মিতায় সিক্ত একজন জীবন শিল্পির পরতে পরতে কি এমন রহস্য লুকায়িত ছিলো যার মৃত্যু আমাদের স্বজন হারানোর বেদনায় আপ্লুত করে, আচ্ছন্ন করে রাখে সারাক্ষণ। মাত্র এিশ বছরের আয়ুস্কাল নিয়ে কোন যাদুমন্ত্রে আমাদের বেঁধে রাখে সারা দিনমান? 

শাহ্ আলমের শিল্পকর্মের গঠনশৈলী নিয়ে আলোকপাত করা যাক। শুরুতেই বলে রাখি শাহ্ আলমের শিল্পচর্চার ব্যাপ্তিকাল মাত্র বিশ বৎসর। প্রথম পনেরটি বছর কেটেছে নিরলস অধ্যাবসায়ের মাধ্যমে চারুকলার গঠনশৈলী আয়ত্ব করার অনুশীলনে। পরবর্তী পাঁচ বৎসরের অধিকাংশ সময়ই সে ব্যয় করেছে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে চারুকলার বীজবপন করতে। তারই ফাঁকে ফাঁকে সে নিজকে ব্যাপৃত রাখতো একান্ত নিজস্ব ধ্রুপদী শিল্পকলার সৃষ্টি জগতে। একথা নি:সন্দেহে বলা চলে যে সে খুব কম সময়ই পেয়েছিলো স্বাধীন শিল্পসৃষ্টির ভাব জগতে ডুবে থাকতে। অবাক কথা তার পরও তার ক্লাসিক শিল্পের যে সন্ধান আমরা পাই তা নেহায়েত নগণ্য নয়। কমপজিশন, রঙ, রেখার পরিপক্কতায় তার নিজস্ব কাঠামোগত অবয়বটি আমরা অনায়াসে শনাক্ত করতে পারি এখানেই শাহ্ আলম অনন্য।

প্রথমে শাহ্ আলমের ড্রইং গঠনশৈলী নিয়ে আলোকপাত করবো। বিশ্বের সমগ্র ড্রইং কাঠামোকে আমরা তিনটি উপভাগে ভাগ করে নিতে পারি। লাইন, ব্রাশ ও স্কেচ ড্রইং। শাহ্ আলম লাইন ড্রইং-এ খুব সিদ্বহস্ত এমনকি ব্রাশ এবং স্কেচ ড্রইং-এ সমান তালে পারদর্শী। তার বিষয়বস্তু  যেমন ব্যাপকভিত্তিক তেমনি ব্যাকরনিক গঠনবৈচিত্রেও সমৃদ্ধ। পূর্বেই উল্লেখ করেছি শাহ্ আলম একজন তরুণ শিল্পি। যে বয়সে তরুণ শিল্পিরা বিশ্বখ্যাত সমকালীন ও পূর্বসূরীদের  ক্লাসিক শিল্পকর্মের গুণগত দক্ষতা এবং গঠনমূলক ভাববৈচিত্রের রহস্য উদঘাটন কিংবা আত্মস্থ’ করার অধ্যাবসায়ে মগ্ন থাকেন শাহ্ আলমের বেলায় ঠিক তেমনটাই দেখতে পাই। 

 

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং-এ উপমহাদেশীয় এমনকি প্রখ্যাত অনেক ইউরোপীয় শিল্পিদের প্রভাব প্রত্যক্ষ করি। উদাহরণত: জয়নূল আবেদীন, কামরুল হাসান, নন্দলাল বসু, সত্যজিৎ রায়, কাইয়ুম চৌধুরী, ইউরোপের স্বনামধন্য ড্রইং শিল্পি গ্রেগ এ্যালবার্টের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ব্রাশ ড্রইং-এ শিল্পচার্য জয়নূল আবেদীন, যামিনী রায় এবং ফ্রান্স প্রবাসী তরুণ শিল্পি শাহাবুদ্দিনের প্রভাব সুস্পষ্ট। ইন্দোনেশিয়া চারুকলার দিকপাল বাগংকুফুদিয়ারদিয়োর প্রভাবও চোখে পড়ার মতো। 

ড্রইংকে ফর্মে ভেঙ্গে নেওয়ার যে পদ্ধতি শাহ্ আলম অনুসরণ করে তার সঙ্গে শিল্পি পাবলো পিকাসোর খানিকটা মিল থাকলেও ফর্ম ভাঙ্গার স্বাপ্নিক বিষয়বস্তুর সঙ্গে হেনরী মাতিস প্রভাবিত শিল্পি কামরুল হাসানের সঙ্গে অধিকমাত্রায় সাজুয্য পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন চিত্রকর্মে স্যুরিয়েল্যাস্টিক শিল্পি সালভাদর ডালির সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিম্নে বিশ্ববিখ্যাত কয়েকজন চিত্রশিল্পির অংকিত শিল্পকর্ম এবং পরবর্তী পৃষ্ঠায় শাহ্ আলমের শিল্পকর্মগুলি সংযুক্ত করা হলো যাতে উল্লেখিত বিষয়গুলির সত্যাসত্য পাঠকবৃন্দ যাচাই করে নিতে পারেন। 

বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের শিল্পকর্ম

১ (ক) মনীষী রোঁমা রোঁলা. পট্রেট. সত্যজিৎ রায়-১ (খ) পট্রেট. সত্যজিৎ রায়-১ (গ) দিলীপকুমারের পট্রেট. সত্যজিৎ রায়  ১(ঘ) রবীন্দ্রনাথের লাইন ব্রাশ ড্রইং, সত্যজিৎ রায়  ।

 

২ (ক) ড্রইং. কালিকলম. জয়নুল আবেদিন

২ (খ) গুনটানা. গোয়াশকালার. জয়নূল আবেদিন

২ (গ) জলরং. জয়নুল আবেদিন

২ (ঘ)  চারটি মুখ. তৈল রং. জয়নুল আবেদিন

৩ (ক)  ড্রইং. জেলপেন. কামরুল হাসান

 

৩ (খ) বাউল. উডকাট. কামরুল হাসান

৩ (গ) দুই কন্যা, জলরং. কামরুল হাসান-

৪ (ক) কালীঘাটের পট. জলরং, যামিনী রায়-

৫ (ক) নৃত্যরতা, তুলিকালি. কাইয়ুম চৌধুরী-

 

৫ (খ)  নিসর্গ. তৈলরং কাইয়ুম চৌধুরী-

৬ (ক) ড্রইং. গ্রেগ এ্যালবার্ট-

৬ (খ) ড্রইং. গ্রেগ এ্যালবার্ট-

৭ (ক) ড্রইং. ব্রীজম্যান-

৭ (খ) ড্রইং. ব্রীজম্যান-

৮ (ক) সায়াহ্নে রবীন্দ্রনাথ. ব্রাশড্রইং নন্দলাল বসু-

৯ (ক) জলরং. সাজাদপুর. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর-

১০ (ক) তেলরং. বাংলাদেশ, শাহাবুদ্দিন-

১০ (খ) তেলরং, শক্তি, শাহাবুদ্দিন-

১১ (ক) ড্রইং, কালিকলম, পাবলো পিকাসো-

১১ (খ) তেলরং, পাবলো পিকাসো-

১১ (গ) গোয়ের্নিকা, পাবলো পিকাসো-

 

১২ (ক) জলরং, হামিদুজ্জামান-

১৩ (ক) তেলরং, বাগং কুফুদিয়ারদিয়ো-

১৪ (ক) তেলরং, মনসুরুল করিম ঠান্ডু ‍-

১৫ (ক) তেলরং, মো: কিবরিয়া-

১৬ (ক) প্যাষ্টাল, সুধীর মিত্র

বিশ্বখ্যাত শিল্পি ও উল্লেখিত শিল্পকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ

সত্যজিৎ রায় ঃ ভারতের একজন অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত স্বনামধন্য চলচিত্র পরিচালক, চিত্রশিল্পি এবং সাহিত্যিক। সম্ভবতঃ শান্তিনিকেতন থেকে তিনি চারুকলায় মাস্টারডিগ্রি অর্জন করেন।

১:ক- সত্যজিৎ রায় অংকিত মনীষী রোমা রোলার কালিকলম মাধ্যমের স্কেচড্রইং।

১:খ- সত্যজিৎ রায় অংকিত কালিকলম মাধ্যমের একটি পট্রেট।

১:গ- সত্যজিৎ রায় অংকিত অভিনেতা দিলীপ কুমারের ব্রাশড্রইং পট্রেট।

১:ঘ- সত্যজিৎ রায় অংকিত রবীন্দ্রনাথের লাইন ঘরনার ব্রাশড্রইং পট্রেট।

জয়নূল আবেদীনঃ শিল্পাচার্য জয়নূল আবেদীন বাংলাদেশের আধুনিক চারুকলার জনক। বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধে কলিকাতা আর্ট কলেজ হতে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

২:ক- জয়নূল আবেদীন অংকিত কালিকলম মাধ্যমের একটি ড্রইং।

২:খ- জয়নূল আবেদীন অংকিত একটি হালকা গোয়াশরং মাধ্যমের ব্রাশ ড্রইং।

২:গ- হালকা জলরং মাধ্যমে অংকিত জয়নুল আবেদীনের একটি ব্রাশ ড্রইং

২:ঘ- জয়নূল আবেদীন অংকিত একটি তৈলচিত্র।

কামরুল হাসানঃ শিল্পগুরু কামরুল হাসান বাংলাদেশের চারুকলা জগতের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর মূল রচনার বিষয় আবহমান গ্রামবাংলা। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সতীর্থ হিসাবে বাংলাদেশে প্রথম চারুকলা কলেজ প্রতিষ্ঠায় তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন।

৩:ক- কামরুল হাসান অংকিত রবীন্দ্রনাথের লাইন ড্রইং।

৩:খ- কামরুল হাসান অংকিত গ্রামবাংলার বাউলের একটি উডকাট ড্রইং।

৩:গ কামরুল হাসান অংকিত দুইকন্যা শিরোনামের একটি লাইন ড্রইং ঘরনার জলরং।

যামিনী রায় ঃ শিল্পি যামিনী রায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভারতের পশ্চিম বাংলার একজন স্বনামধন্য চিত্রশিল্পি।

৪:ক- শিল্পি যামিনী রায় অংকিত চিরায়ত বাংলার কালীঘাটের পটভিত্তিক হালকা জলরং-এর একটি শিল্পকর্ম।

কাইয়ুম চৌধুরী ঃ শিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী বাংলাদেশের গন্ডী পেরিয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠিত একজন চিত্রশিল্পি। ঢাকা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসাবে তিনি ষাটের দশকে ¯œাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ।

৫:ক- বাংলাদেশের আধুনিক লোকজ ঘরনার শিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী অংকিত তুলিকালি মাধ্যমের নৃত্যরতা শিরোনামের একটি লাইন ড্রইং

৫:খ- দ্বিমাত্রিক ফর্মে উপস্থাপিত কাইয়ুম চৌধুরী কর্তৃক অংকিত বাংলাদেশের নিসর্গভিত্তিক একটি তৈলচিত্র।

 গ্রেগ এ্যালবার্টঃ আধুনিক ইউরোপের ড্রইং ঘরনার সাড়াজাগানো একজন চিত্রশিল্পি।

৬:ক- গ্রেগ এ্যালবার্ট অংকিত অসংখ্য সুক্ষ্ণ  লাইনের সমন্বয়ে একটি স্কেচড্রইং।

৬: খ- গ্রেগ এ্যালবার্ট অংকিত ব্রাশ ও লাইন ড্রইং-এর তিনটি ক্লাসিক মানের শিল্পকর্ম।

ব্রিজম্যানঃ ব্রিজম্যান অষ্টাদম শতাব্দীর ইউরোপে একজন কালজয়ী প্রতিভা ছিলেন। ব্রিজম্যানকে আধুনিক ড্রইং এর জনক বলা হয়।

৭:ক- ব্রিজম্যান অংকিত লাইন ও স্কেচ ঘরনার অপূর্ব তিনটি ড্রইং।

৭:খ- সারক্যাল স্ট্রিক দিয়ে অংকিত ব্রিজম্যানের একটি অনন্য সাধারণ ড্রইং।

নন্দলাল বসুঃ নন্দলাল বসু ছিলেন শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র। নন্দলাল বসু পশ্চিমবঙ্গ চারুকলা জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা।

৮:ক- নন্দলাল বসু অংকিত তুলিকালির লাইন ড্রইং।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরঃ শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ চারুকলা দিকপাল। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতৃস্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ মুগল মিনিয়েচার পেইন্টিং- এর ঘরনাঘেষা আধুনিক ওরিয়েন্টাল আর্টের জনক।

৯:ক- অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অংকিত জলরং নিসর্গচিত্র।

শাহাবুদ্দিনঃ শিল্পি শাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের অন্যতম সৃজনশীল প্রতিভা। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের জাতীয় শিল্পির মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। রং ও রেখার ছন্দময় চিত্রকর্মে পরম গতিশীল উপস্থাপনার যে দক্ষতা শাহাবুদ্দিন দেখিয়েছেন তা সত্যিই অভূতপূর্ব।

১০:ক- শাহাবুদ্দিন অংকিত তৈলরং বাংলাদেশ। 

১০:খ- শাহাবুদ্দিন অংকিত তৈলরং শক্তি।

পাবলো পিকাসোঃ পাবলো পিকাসো বিংশ শতাব্দীর চারুকলা জগতে এক বিস্ময়কর প্রতিভা। পল সেজান যে কিউবিজমের বীজ রোপন করেন সে অংকুরিত বীজটি পাবলো পিকাসোর হাতে বিশাল একটি বটবৃক্ষে স্থিতিলাভ করে। চারুকলার সব কয়টি মাধ্যমেই ছিলো তাঁর অবাধ ও স্বত:স্ফুর্ত বিচরণক্ষেত্র। পাবলো পিকাসোর তুলনা শুধু পাবলো পিকাসোর সঙ্গেই চলতে পারে।

১১:ক- পাবলো পিকাসোর অংকিত নৃত্যরতা মহিলার কালিকলমের স্কেচ ড্রইং।

১১:খ- পাবলো পিকাসোর আঁকা কিউবিক ঘরনার তৈলচিত্র নৃত্যরতা রমনী।

১১: গ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্বে অংকিত পিকাসোর সাড়াজাগানো তৈলচিত্র গোয়ের্নিকা।

শিল্পি হামিদুজ্জামানঃ শিল্পি হামিদুজ্জামান বাংলাদেশের জলরং-এর ইতিহাসে ফোটাভিত্তিক শিল্পকর্মের প্রধান দিকপাল। সৃজনশীল ভাস্কর হিসাবেও তাঁর খ্যাতি সুবিদিত।

১২:ক- শিল্পি হামিদ্জ্জুামান অংকিত নিসর্গভিত্তিক একটি জলরং। 

বাগং কুফুদিয়ারদিয়োঃ বাগং কুফুদিয়াদিয়ো আধুনিক ইন্দোনেশিয়ার চারুকলা জগতের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃজনশীল প্রতিভা।

১৩:ক- বাগং কুফুদিয়ারদিয়ো অংকিত তিনটি মুখ শিরোনামের একটি তৈলচিত্র। 

মনসুরুল করিম ঠান্ডু ঃ শিল্পি মনসুরুল করিম ঠান্ডু ইমপ্রেসনিষ্ট ঘরনার একজন শিল্পি। তিনি ঢাকা ইউনির্ভাসিটি থেকে সত্তর দশকে চারুকলার উপর মাষ্টার ডিগ্রি লাভ করেন।

১৪:ক- শিল্পি মনসুরুল করিম ঠান্ডু অংকিত ইমপ্রেসনিষ্ট ঘরনার একটি তৈলচিত্র। 

 মোঃ কিবরিয়াঃ শিল্পি মোঃ কিবরিয়া বাংলাদেশের এবস্ট্রাক্ট এক্সপেসনিজম ঘরনার প্রধান দিকপাল।

১৫:ক- শিল্পি মোঃ কিবরিয়া অংকিত শিরোনামহীন শিরোনামের একটি এবস্ট্রাক্ট এক্সপেসনিজম ঘরনার তৈলচিত্র।

শিল্পি সুধীর মিত্র ভারতীয় তরুন প্রজন্মের একজন প্রতিশ্রæতিশীল চিত্রশিল্পি। প্যাস্টালরং এর উপর তার দক্ষতা সর্বজনবিদিত।

১৬:ক- শিল্পি সুধীর মিত্রের প্যাস্টালরং- এর আঁকা একটি চিত্রকর্ম।

 

শাহ্  আলমের চিত্রকর্ম

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ১-৯ 

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ১ ।। জাগো

 

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ২

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৩

 

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৪

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৫

 

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৬

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৭

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৮

শাহ্ আলমের লাইন ড্রইং: ৯

 

 

 

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১০ 

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১১ 

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১২

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৩ 

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৪ ।। স্নানরতা

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৫ ।। নারী

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৬ 

শাহ্  আলমের চিত্রকর্ম (১৭)

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৭ 

শাহ আলমের চিত্রকর্ম ১৮শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৮

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ১৮ শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ১৯

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ২০

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ২০

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২১

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২১

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২২

শাহ আলমের জলরং এর ওয়াশ সহ ব্রাশ ড্রইং ২২ ।। বাঙলা - বাঙালী

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৩।। চৈতন্য

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৪

শাহ আলমের জলরং এর ওয়াশ সহ ব্রাশ ড্রইং ২৪ ।। অপরাজিতা

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৫

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৫

 

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং: ২৬

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৬

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৭

শাহ আলমের ব্রাশ ড্রইং ২৭

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং

 

গিয়াসউদ্দিন আহমদ II শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং | গিয়াসউদ্দিন আহমদ । ২৮

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং ২৯ ।। অধ্যক্ষ কৃষ্ণ কুমার পাল চৌধুরী

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং ৩০ ।।  কবি নির্মলেন্দু গুণ 

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং।। শাহ আবদুল করিম

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং ৩১ ।। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

শাহ আব্দুল করিম ।

শাহ আলমের পট্রেট ড্রইং ৩২ ।। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

শাহ্ আলমের ড্রইং

শাহ্ আলমের ড্রইং

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৩

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৩

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৪

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৩

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৫

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৩

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৬

শাহ্ আলমের ড্রইং

 শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৭

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৮

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৮

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৯

শাহ্ আলমের ড্রইং ৩৯

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪০

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪০

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪০

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪১

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪২

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪২

 শাহ্ আলমের ড্রইং ৪৩

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪৩

 শাহ্ আলমের ড্রইং ৪৪

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪৪

শাহ্ আলমের ড্রইং ৪৫

শাহ্ আলমের পেন্সিল ড্রইং ৪৬

 

শাহ্ আলমের জলরং 

 

শাহ্ আলমের জলরং  ৪৭

শাহ্ আলমের জলরং  ৪৮

শাহ্ আলমের জলরং  ৪৯

শাহ্ আলমের জলরং  ৫০

শাহ্ আলমের জলরং  ৫০

শাহ্ আলমের জলরং  ৫১ ।। পঁচ ফোড়ন

শাহ্ আলমের জলরং  ৫২

শাহ্ আলমের জলরং  ৫২

শাহ্ আলমের জল রং ৫৩

শাহ্ আলমের জলরং  ৫৩

শাহ্ আলমের জল রং ৫৪

শাহ্ আলমের জল রং ৫৪ ।। বৃত্তাবদ্ধ নর-নারী

শাহ্ আলমের জল রং ৫৫

শাহ্ আলমের জল রং ৫৫

শাহ্ আলমের জল রং ৫৬

শাহ্ আলমের জল রং ৫৬

শাহ্ আলমের জল রং ৫৭

শাহ্ আলমের জল রং ৫৭ ।। প্রাচীর

শাহ্ আলমের জল রং ৫৮

শাহ্ আলমের জল রং ৫৮ ।। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম

শাহ্ আলমের ব্রাশ ড্রইং ৫৯ ।।  কবি কাজী নজরুল ইসলাম

শাহ্ আলমের জল রং ৬০

শাহ্ আলমের জল রং ৬০ ।। হিমাংশু শেখর ধর

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালারে করা    ৬১  সায়াহেৃ নজরুল

শাহ্ আলমের জল রং ৬২

শাহ্ আলমের জল রং ৬২  আব্দুস সামাদ আজাদ

শাহ্ আলমের জল রং ৬৩ ।। কবি নির্মলেন্দু গুণ

শাহ্ আলমের তৈলরং ৬৪ ।। উর্বশী 

শাহ্ আলমের তৈলরং ৬৫ ।।  বাসন্তিকা

শাহ্ আলমের তৈলরং ৬৬ ।। জীবন-১

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৬

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৭ ।। নন্দিতা 

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৭

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৮ ।। জীবন - ২

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৭

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৬৯  ।। 

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭০ ।। সুমিত্র

 

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭১ ।। চন্দ্রাহত

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭২ ।। নিমগ্ন

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭৩

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭২

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭৪

শাহ্ আলমের এক্রেলিক কালার ৭৫

শাহ্ আলমের ডিজাইন করা প্রচ্ছদ ডিজাইন ৭৬।।  সিলেট প্রসেনিয়াম 

প্রারম্ভে শাহ্ আলমের পট্রেট ড্রইং দিয়ে শুরু করি। শাহ্ আলমের পট্রেট ড্রইং অভিনব। অংকিত পট্রেট মুখাবয়ে ব্যক্তির চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা বিশ্বের অল্পসংখ্যক শিল্পির তুলিতেই সঠিকভাবে এসেছে। লাইন ড্রইং দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে শাহ্ আলম উল্লেখিত শিল্পিদের পট্রেট ড্রইং সম্বন্ধে কতো সচেতন ছিলো। শাহ্ আলমের ড্রইং অভিনব। এ প্রসঙ্গ যার যা আঙ্গিক ও অংকনগত ভিন্নতা সত্ত্বে ও যাদের নাম সর্বজন স্বীকৃত তাঁরা হলেন, লিউনার্দো দা-ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, রাফায়েল, ভিনসেন্ট ভ্যানগগ, রেমব্রান্ট, ভেলেসকাস, পিকাসো, সত্যজিৎ রায়, জয়নুল আবেদীন, নন্দলাল বসু, কামরুল হাসান, আব্দুর, রাজ্জাক প্রমুখ। পূর্বেই বলেছি শাহ্ আলম লাইন ড্রইং এ সিদ্ধহস্ত। শাহ্ আলম গ্যালারীর ১নং জাগো শিরোনামের লাইন ড্রইংটি একটি চমৎকার উপস্থাপনা। টান টান ভঙ্গিতে ক্ষুধিত একটি ঘোড়ার নীচেই নিরাবরন অসহায় মহিলার ড্রইং-এর প্রতীকী ব্যাঞ্জনা খুবই তাৎপর্যময়। ঘোড়া শক্তির প্রতীক আর মহিলা পরনির্ভরশীল অসহায়ত্বের প্রতীক। এ ধরণের চিন্তার সাযুজ্য আমরা শিল্পি পিকাসো ও সালভাদর ডালির মধ্যে দেখতে পাই। গ্রামবাংলার আপন ঘরনার শিল্পি কামরুল হাসানের মধ্যে রয়েছে এককই ধরণের প্রতীকী ব্যাঞ্জনা। শাহ্ আলমের রেখার বলিষ্ঠতা, গতিশীল কোমলতা শিল্পগুরু কামরুল হাসানের কথাই বার বার মনে করিয়ে দেয়। চিত্রে বিষয়বস্তুর আমেজটা শাহ্ আলমের নিজস্ব। এ্যালবামের ২,৫ ও ৭ নং চিত্রকর্ম তিনটির ভাব-ছন্দ এবং রেখার আমেজ বড়বেশী কামরুল হাসান ঘেষা। ২নং ড্রইং-এ তাড়াহুড়ো ভাবটি খুবই প্রকট, রেখা এখানে গতিহীনতার আমেজে আক্রান্ত, ড্রইং-এর দুর্বলতাও দৃষ্টিকটু ঠেকে তবুও রেখার কমনীয়তা, পরিবেশগত ইলুশন যেন পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে, এ্যালবামের ৪নং ড্রইংটি সতেজপ্রাণ বলিষ্ঠ ড্রইং। প্রচ্ছন্নভাবে হলেও এখানে জয়নূলের প্রভাব লক্ষণীয়। পিকাসোর দ্বিমাত্রিক ঘরনার আঙ্গিকে উপস্থাপিত হলেও চিত্রটি মূলত: আধা দ্বিমাত্রিক তেমনি আধা ত্রিমাত্রিকও বটে। ছবিতে বাহ্যিকভাবে গ্রামবাংলার বাউলের পুরোপুরি আদল খুঁজে পাওয়া যায় না তবুও বাউল অন্তরের মরমীয়া রূপের চরিত্রটি এখানে স্পষ্ট। ৮ ও ৯নং ড্রইং এ ফ্যান্টাসীর ছোয়া রয়েছে। কার্টূনঘেষা ড্রইং দ্বয়ে চিত্রকল্প ও রূপদর্শনের মুন্সিয়ানা দারুণ উপভোগ্য বিশেষ করে ৯নং ড্রইংটিতে অধিকমাত্রায় প্রকাশিত। ৯নং ড্রইংটিতে স্পেসের মধ্যে ব্রাশিং-এর মাধ্যমে রেসের ঘোড়াকে টেনে নিয়ন্ত্রণ রাখার কৌশল অভিনব। পেন্সিলস্কেচে আঁকা ৬নং ড্রইংটি একটি ভিন্ন প্রকৃতির। একটি চতুস্কোন জমিনের মধ্যে অনুসন্ধানী করুণ দু’টি চোখের অবয়ব পরম গতিশীল মোহনীয় ড্রইং আবেশে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তরুণ চিত্রশিল্পি মনসুরুল করিম ঠান্ডুর ইমপ্রেসনিজমের কায়দায় অংকিত একটি তৈলরং শিল্পকর্মের কথা মনে করিয়ে দেয় (চিত্র নং-১৪:ক)। পুরুষ শিরোনামের ৩নং ড্রইংটি একটি ক্লাসিক মানের লাইন ড্রইং। কি রেখায়, কি ছন্দে, কি ভাববৈচিত্রে ড্রইংটি একটি মাস্টারপিস শিল্পকর্ম। বিশ্ববিখ্যাত ড্রইং মাস্টার ব্রিজম্যানের ড্রইং-এর সঙ্গে এর সাজুয্য লক্ষণীয় (চিত্র নং-৭:খ)।

 

শাহ্ আলমের ব্রাশ ড্রইং নিয়ে এখন আলোচনা করবো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শাহ্ আলমের অধিকাংশ ড্রইং শিরোনামহীন তেমনি স্বল্প সংখ্যক ড্রইং ব্যতিত অধিকাংশ ড্রইংএ কোন স্বাক্ষর নেই। অনুমান করি শাহ্ আলমের মোট ড্রইং এর সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও অধিক। স্বাক্ষরবিহীনতার পক্ষে দু’টি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত: তার অংকিত ড্রইংগুলি বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস ও কাব্যগ্রন্থের শোভা বর্ধনে ব্যবহৃত হয়েছে সেজন্য শাহ্ আলম স্বাক্ষর প্রদান খুব জরুরী বলে মনে করেনি। দ্বিতীয়ত: শাহ্ আলমের ব্যক্তিগত বিশ্বাস তার অধিকাংশ ড্রইংই চুড়ান্ত কোন শিল্পকর্ম নয়, খসড়ামাত্র। একটি অতৃপ্তিবোধই স্বাক্ষর দানে তাকে বিরত রেখেছে। সবিনয়ে উল্লেখ করতে চাই যেকোন দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করা হোক না কেন শাহ্ আলমের খসড়া ড্রইংগুলি মোটেই সাধারণ মানের ড্রইং নয়। ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোন হতে বিবেচিত তথাকথিত খসড়া ড্রইংগুলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শাহ্ আলমের ভাবচৈতন্য কত গভীর, প্রাজ্ঞ এবং প্রাগ্রসরচেতনা সমৃদ্ধ শিল্পকর্ম। গুণগত দৃষ্টিকোন হতে বিশ্বদরবারে শাহ্ আলমের ড্রইং এর স্থান কোথায় এটাই আমি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোন হতে প্রমাণ করার চেষ্টা করবো। শাহ্ আলমের ব্রাশ ড্রইংকে আমরা ৬টি উপভাগে ভাগ করে নিতে পারি। এ্যালবামের ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ২০, ২৫ নং ড্রইং নিয়ে ‘ক’ বিভাগ। ১৬নং ও ১৭নং ড্রইং নিয়ে ‘খ’ বিভগ। ১৮ এবং ১৯ নং ড্রইং নিয়ে ‘গ’ বিভাগ। ২২, ২৩, ২৪ নং ড্রইং নিয়ে ‘ঘ’ বিভাগ, ২১ নং ড্রইং নিয়ে ‘ঙ’ বিভাগ ২৬ ও ২৭ নং ড্রইং নিয়ে ‘চ’ বিভাগ। ‘ক’ বিভাগের ড্রইংগুলিতে জয়নূল আবেদীনের প্রভাব সুস্পষ্ট। ‘খ’ বিভাগের ১৬, ১৭ নং ব্রাশ ড্রইংগুলি বিষয়বস্তুর দুষ্টিকোণ হতে কামরুল হাসানের প্রভাবে প্রভাবান্বিত কিন্তু অংকনগত স্টাইলের বিচারে কার্টূনিষ্ট শিশির ভট্টাচার্যের প্রভাব লক্ষণীয়। ‘গ’ বিভাগের ড্রইংগুলি মাতিসের প্রভাবে প্রভাবাম্বিত যদিও বিষয়বস্তু হিসাবে এদেশীয় কাঁদা-মাটির ফসল। ‘ঘ’ বিভাগের ২২নং চিত্রটি জয়নূল ঘরনার কাজ তবে ২৩, ২৪ নং ড্রইংদ্বয়ে তরুণ প্রবাসী শিল্পি শাহাবুদ্দিনের প্রভাব সুষ্পষ্ট। ‘ঙ’ বিভাগের ২১নং ড্রইংটির প্রভাব অজ্ঞাত। ‘চ’ বিভাগের ড্রইং দুইটি সত্যজিৎ রায়ের অংকন পদ্বতি সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। (চিত্র নং১:গ) ‘ক’ বিভাগের ড্রইংগুলি জয়নূল আবেদীন দ্বারা প্রভাবিত হলেও এগুলিতেও আবেদীনের গভীর মননশীলতা ও কুশলী গতিপ্রকৃতির ছাপ অস্পষ্ট। কমপজিশন ও আলোছায়া ব্যবহারের পদ্ধতি শাহ্ আলমের নিজস্ব। ব্রাশ ব্যবহারের গভীরতা থাকা সত্ত্বে ও কেমন যেন স্থবিরতায়  আবদ্ধ। ১৪নং স্নানরতা শিরোনামের ড্রইংটি অবশ্য এখানে ব্যতিক্রমধর্মী। সতেজ লাইন ও ব্রাশিং এর ছন্দোময় ভঙ্গি, সুচারু বুনন, উচ্ছল তারুণ্য সব মিলিয়েই ড্রইংটি অপূর্ব। কামরুল, জয়নূলের দ্বৈত সুর ও ছন্দের আবেশে আন্দোলিত। ‘ক’ বিভাগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ড্রইং হচ্ছে নারী শিরোনামের ১৫ নং ড্রইংটি। জয়নুল-কামরুলের অনেকটা প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে শাহ আলম এখানে উদ্ভাসিত । এদেশের ড্রইং ঘরনার একটি উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হিসাবে এটিকে গণ্য করা যেতে পারে। ‘খ’ বিভাগের ১৬নং চিত্রটি কামরুল হাসানের কালজয়ী শিল্পকর্ম ‘শয়তানের মুখ’ চিত্রটির কথা স্মরণ করে দেয়। ‘ঘ’ বিভাগে আমরা তিনটি উল্লেখযোগ্য ব্রাশ ড্রইং প্রত্যক্ষ করি। বাঙলা-বাঙালি শিরোনামের ২২নং ড্রইংটি জয়নূল আবেদীনের বিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘গুণটানা’ (চিত্রনং-২/খ) শিরোনামের ড্রইং দ্বারা প্রত্যক্ষ প্রভাবে প্রভাবিত। অংকনগত ড্রইং স্টাইল যদি আমরা অগ্রাহ্য করি তবে বিষয়বস্তু নির্বাচনে শাহ্ আলমের নিজস্বতা রয়েছে। বাউল ঘরনার এ ছবিটিতে ড্রইং প্রাণবন্ত, কমপজিশন মার্জিত এবং স্পেস মেইনটেন যথাযথ। ড্রইং এর ছন্দ ও ব্রাশিং এর আমেজ নিয়ে ড্রইংটি আপন বৈভবে সমুজ্জল। ‘ঘ’ সিরিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হলো চৈতন্য শিরোনামের ড্রইংটি। অতুলনীয় কম্পোজিশন ও মাস্টার পিস ড্রইং নিয়ে বাংলার দামাল ছেলেদের ঘুর্ণিঝড়ের মতো গতিশীল চরিত্রের অফুরন্ত উচ্ছাস যেন ঝলকে বের হচ্ছে। তরুণ শিল্পি শাহাবুদ্দিনের গঠন শৈলীর সঙ্গে ড্রইংটির সাজুয্য ছবির মূলভিতকে অনেকটা দূর্বল করে ফেলে (চিত্র নং ১০: ক এবং ১০: খ)। ‘ঘ’ সিরিজের অপরাজিতা শিরোনামের ব্রাশ ড্রইংটি অংকনশৈলী ও বিষয়বস্তুর আমেজে অভূতপূর্ব। নিঃসন্দেহে এটি শাহ্ আলমের একটি মৌলিক শিল্পকর্ম। ঘন কালো অন্ধকারের বলয় ভেঙ্গে শাহ্ আলমের কল্পিত নারী যেন উঠে দাড়াচ্ছে। এ নারী গ্রামবাংলার কোন নারী নয় শহরের শিক্ষিত আত্মমর্যাদাশীল নারী। আত্মশক্তির দৃঢ়তা নিয়ে ঝড়-ঝঞ্জার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে তারা বদ্ধপরিকর। কমনীয় গতিশীল ব্রাশিং, সত্যনিষ্ট যুক্তিপ্রাণের ব্যাকুলতা ও চৈতন্যের গভীরতা নিয়ে ড্রইংটি শাহ্ আলমের উল্লেখযোগ্য শিল্লকর্মগুলির মধ্যে অন্যতম। ‘ঙ’ সিরিজের ২১নং ড্রইংটিতে মুন্সিয়ানার ছাপ বলিষ্ঠ। জ্যামেতিক ফর্মের আদলে অংকিত ড্রইংটির তাল-লয়ের গভীরতা ও পরিচ্ছন্ন ভাব সহজেই মন কাড়ে। অজ্ঞাত কোন শিল্পি দ্বারা প্রভাবিত এ ড্রইংটির মিষ্টি মধুর সতেজ আমেজ আমাদের প্রশান্তির ছায়াতলে নিয়ে যায়। 

 

এবার শাহ আলমের ড্রইং পট্রেট নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করতে চাই। শাহ আলমের ড্রইং পট্রেটকে দুইটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।  বিশুদ্ধ লাইন ড্রইং (খ) অসংখ্য লাইন সমন্বয়ে স্কেচ ড্রইং। ২৯নং ড্রইংটি হলো মদনমোহন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যক্ষ কৃষ্ণকুমার পাল চৌধুরীর পট্রেট। একথা অনস্বীকার্য যে শাহ্ আলম পট্রেটটি অংকনে চলচিত্র পরিচালক ও চিত্রশিল্পি সত্যজিৎ রায়ের কাছে ঋণী। এ উপমহাদেশে স্বল্প সংখ্যক শিল্পি রয়েছেন যাঁরা অংকিত পট্রেটের চোখের মনিতে ব্যক্তির চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। প্রসঙ্গত সত্যজিৎ রায়, নন্দলাল বসু, জয়নূল আবেদীন, কামরুল হাসান, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ শিল্পিদের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শাহ্ আলম নিঃসন্দেহে উল্লেখিত স্বনামধন্য শিল্পিদের কাতারে ঠাঁই করে নিয়েছে। প্রসঙ্গত শাহ্ আলম অংকিত ২৯, ৩০, ও ৩১নং পট্রেটগুলির উল্লেখ করা যেতে পারে। ২৯নং পট্রেট মাত্র কয়েকটি গতিশীল রেখার মাধ্যমে শাহ্ আলম ব্যক্তির অর্ন্তনিহিত চরিত্রকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তার তুলনা সত্যিই বিরল। ৩০নং পট্রেটে কবি নির্মলেন্দু গুণের আত্মসমাহিত প্রজ্ঞা, চোখের মনিতে চারিত্রিক দৃঢ়তা কয়েকটি সুক্ষ রেখার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার যে দক্ষতা শাহ্ আলম দেখিয়েছে তা অভিনব। ৩১নং পট্রেটে বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের সহজ সরল গ্রামীণ অবয়ব, চোখের গভীরে লোকায়িত দর্শন ও মমত্ববোধ, ঠোঁটের অতলে নিষ্পাপ হাসির রেখা এ সবকিছুই শাহ্ আলমের তুলিতে সম্ভব। তাই পট্রেট ঘরনাশিল্পে শাহ্ আলম শুধু সার্থকই নয় অসাধারণ। এবার শাহ্ আলমের স্কেচ ড্রইং-এর সৌন্দর্য ও ইতিবাচক জীবনবোধ সম্বন্ধে আলোচনা করবো। শাহ্ আলমের স্কেচ ড্রইংকে আমরা চারটি উপভাগে ভাগ করতে পারি। ৩৩ ও ৩৪ নং ড্রইং দু’টিতে আমরা প্রত্যক্ষ করি অসংখ্য সুক্ষ রেখার পারস্পরিক সমন্বয়ে গঠিত গতিশীল ও কমনীয় ছন্দ মাধুর্য্য। রেখার শক্তি এমনই চোখ যেন লেপ্টে থাকে সৃষ্টিকর্মে, কিছুতেই সরতে চায় না। ৩৩ নং ড্রইটি একজন গ্রাম্য তরুণীবধুর প্রতিকৃতি। ৩৪ নং ড্রইং-এ মা ও ছেলের উপস্থিতি একটি বিশেষ ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করা হয়েছে। আমাদের চিরচেনা গ্রামবাংলার মাতৃহৃদয়ের পরিচয় এতে পাই। পরবর্তী ৩৫, ৩৬, ৩৭নং ড্রইং তিনটি ব্রাশধর্মী স্কেচ ড্রইং। গতিশীল সরলতার ইমেজ নিয়ে বিষয়বস্তু আবর্তিত। ৩৭নং ড্রইং-এ সামান্য কয়েকটি গতিশীল লাইনের মাধ্যমে সুন্দর ও সাবলীনভাবে কয়েকটি নৌকার সমাবেশ দেখানো হয়েছে। গায়ে গায়ে লাগানো নৌকাগুলি জট পাকানো অবস্থায় নেই প্রত্যেক নৌকাই নিজস্ব স্বাতন্ত্রতা নিয়ে উদ্ভাসিত। তৃতীয় ধাচের স্কেচ ড্রইং গুলির নির্মাণ কৌশলের প্রকৃতি ভিন্নতর। ত্রিমাত্রিক রিয়েলিজম ভিত্তিক শিল্পকর্ম নয় দ্বিমাত্রিক ফর্মে মুন্সিয়ানার শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪৩ নং ড্রইংগুলি একই ঘরনার অনুপম সৃষ্টি। উল্লেখ্য যে উল্লেখিত ঘরনার ড্রইংসমূহ ইউরোপিয়ান শিল্পি গ্রেগ এ্যালবার্টের নির্মাণ কৌশলের প্রভাবে প্রভাবান্বিত (দেখুন গ্রেগ এ্যালবার্টের ড্রইং ৬: ক)। শেষোক্ত ধারার ড্রইংগুলি খুবই মননশীল শিল্পকর্ম। প্রসঙ্গত ৪৫ ও ৪৬ নং ড্রইং দু’টির উল্লেখ করা যেতে পারে। স্যুারেলিজমের প্রতীকী কলাকৌশলের কষাঘাতে ও ইমপ্রেসনিজমের সামাজিক মূল্যবোধের মর্মকথা এখানে পারস্পরিক পরম্পরায় কাজ করে। দৃষ্টিনন্দন কমপজিশন ও ড্রইং এর মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয়ের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ড্রইং দুটিকে ভিন্নতর মাত্রা দান করে।

 

 

শাহ্ আলমের জলরং- এর ভূবনে দৃষ্টি ফেরাই। ৪৭, ৪৯,৫৫, ৫৬ নং জলরংগুলি ল্যান্ডস্কেপ ভিত্তিক শিল্পকর্ম। ৪৭ নং জলরং চিত্রে আমরা প্রকৃতিকে সরাসরি গভীর মায়া আবেশে পাই। জীবনকে ধারণ করে প্রকৃতি এখানে গভীর ইতিবাচক তাৎপর্য নিয়েই প্রতিভাত হয়। চিত্রটি রিয়েলিজম ঘরনার শিল্পকর্ম হলেও এখানে অবচেতন ভাবে কিউবিজমের মূল সুরের ব্যাঞ্জনা লক্ষণীয়। উপরের স্পেস জুড়ে কুন্ডুলী পাকানো বৃত্তের মতো পক্রগুচ্ছের অবস্থান তেমনি নীচের অংশেও সেরকম অভিব্যক্তির প্রকাশ রয়েছে। উপর-নীচকে ভেদ করেছে কয়েকটি ভারডিক্যাল লাইন যার আকৃতিগত স্বরূপ হচ্ছে ত্রিভূজ, আয়তক্ষেত্র ও বর্গক্ষেত্রের জ্যামিতিক বিন্যাস। চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু জুড়ে সমস্ত কাজ জমাট বেঁধে আছে কিন্তু ডান ও বামদিকের বিস্তর জমিন রয়েছে ফাঁকা যেখানটায় রং বা ড্রইং এর কোন কাজ নেই। ব্যাপারটি কমপজিশনের আংশিক দূর্বলতাকে প্রকাশ করে। একই ঘরনার জলরং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ল্যান্ডস্কেপ সাজাদপুর ( চিত্র নং ৯:ক)। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পেস মেইনটেইনের জাদুকরী ক্ষমতাকে এখানে আমরা প্রত্যক্ষ করি। বাদিকের উপরের স্পেসটি ঘন সবুজ রং এর মাধ্যমে ঢেকে দেয়া হয়েছে যা কুন্ডলী পাকানো বৃত্তের সঙ্গে তুলনীয়। মাঝখানটায় হরাইজেন লাইনের মোটা ব্রাশিং রয়েছে এবং নিচের অংশের বামদিকে পূর্বে উল্লেখিত উপরের ডানদিকের কুন্ডলী বৃত্তের সঙ্গে সমতা রেখে ঘন ও ভারী রং এর প্রলেপ রয়েছে যা চোখকে ব্যালান্সের বৃত্তে টেনে নিয়ে আসে। সেই সঙ্গে রয়েছে পরিবেশগত রং ও ইলুশনের অপূর্ব সমন্বয় যা আমাদের আপ্লুত করে। এখানেআমরা অবনীন্দ্রনাথের প্রাজ্ঞ চৈতন্য ও অংকন নৈপুন্যের দক্ষতার প্রমান পাই যা শাহ্ আলমের জলরং- এ ধরা দেয় কিশোর সুলভ দুরন্ত উচ্ছাসরূপে। প্রসঙ্গত এখানে কাইয়ুম চৌধুরী অংকিত কিউবিজম ঘরনার তৈলচিত্র নিসর্গ শিরোনামের একটি শিল্পকর্মের উল্লেখ করতে পারি। অত্যন্ত সচেতনভাবে কিউবিজম ফর্মে জীবন ও প্রকৃতির সমন্বয় করতে শিল্পি কাইয়ুম চৌধুরী যে অদ্বিতীয়তার পরিচয় দিয়েছেন তা অভিনব। প্রাকৃতিক বিন্যাসকে তিনি কত সুচারুভাবে ত্রিভূজ, বৃত্ত, অর্ধবৃত্ত, চতুর্ভূজ ফর্মে ভেঙ্গে নিয়ে নীল-সবুজ রং-এর প্রাধান্যে কমনীয় এবং মোহনীয় গুরুগম্ভীর পরিবেশের ছন্দ সৃষ্টি করেছেন তার তুলনা বিরল। পিকাসোর সঙ্গে ফর্ম ভাঙ্গার পদ্ধতির মিল থাকলেও এখানে তিনি বাংলার জীবন ও প্রকৃতিকে ক্লাসিক মেজাকে সুষ্ঠুভাবে উপস্থাপনা করতে সক্ষম হয়েছেন। কাইয়ুম চৌধুরীর শক্তির পরিচয় মূলত: এখানেই।

শিল্পি হামিদুজ্জামানের জলরং-এ স্টোক বা ফোঁটা পদ্ধতির গঠনবৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করি (চিত্র নং ১২:ক) শাহ্ আলমের জলরঙে-এ ধরণের গঠন প্রক্রিয়ার কারুকাজ নেই। সম্ভবত: ফোটা পদ্ধতির অর্ন্তমূখী রক্ষণশীলতা শিল্পি শাহ্ আলমকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। শাহ্ আলমের পছন্দ ব্রাশ পদ্ধতি যার ব্যাপ্তি ও গভীরতা অবনীন্দ্রনাথ, জয়নূল, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, বিকাশ ভট্টাচার্য্য এমন কি হাল আমলের ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করি।

শাহ্ আলমের দ্বিতীয় পর্যায়ের জলরং গুলির মধ্যে পড়ে ৪৮, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩, ৫৪ এবং ৫৭ নং জলরং গুলি। উল্লেখিত জলরং গুলির বিষয়বস্তু দু’ভাগের বিভক্ত। ৪৮ নং জলরং সমকাল ও ৫৭ নং জলরং প্রাচীর একই ঘরনার আলাদা মেজাজের জলরং। উল্লেখিত জলরং গুলির মেজাজী ঢংটি স্যুরেলিজম ভিত্তিক হলেও সামগ্রিক বিবেচনায় ইমপ্রেসনিজমের সঙ্গেই সাজুয্য বেশী পরিলক্ষিত হয়। এ দুই পদ্ধতির মিলনের ফলশ্রæতিতে যে বীজ আমরা পাই তা এদেশের কাঁদা-মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত তবে সহজবোধ্য নয়। তার এ কাজগুলি বুঝতে হলে চারুকলার উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ থাকতে হবে নইলে পুরোপুরি এর রসালো শিকড়ের সন্ধান পাওয়া যাবে না। কি আছে এসব শিল্পকর্মে? ৫০ নং জলরং শিরোনামহীন চিত্রটি একঝলক আলোর সঙ্গে তুলনীয়। কোন চিরচেনা বস্তুর ছায়া যখন আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তখন মুল ছবির অবয়ব অনেক সময় প্রতিভাত হয়না বরঞ্চ বস্তুর পরিবর্তনশীল বিকৃত রূপটি দৃষ্টগোচর হয়। একই অবয়বে তৈরী ৫২ও ৫৩ নং জলরং দু’টি। ৫১ নং জলরং পাঁচফোড়ন ফ্যান্টাসীর মোড়কে সৃষ্টি স্যুরেলিজম ঘরনার একটি চমৎকার জলরং।  আমাদের সামাজিক অন্ত:সারশূণ্য প্রজ্ঞাকে বিদ্রুপ করে পাঁচটি কিশোরের মুখ যা সমাজ কর্ণধারদের সুনিপুন জালে আবদ্ধ অনেকটা কৃষ্ণগব্বরের ঘটনা দিগন্তের মধ্যে বস্তুর আটকে পড়া অবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। ব্যাপারটা এমনই লোমহর্ষক যে তারা না পারছে বেড়িয়ে আসতে, না পারছে কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছতে। অনবরত প্রজন্মের পর প্রজন্মের ঘুরপাক খাওয়াই এর নিয়তি। এধরণের চিত্রকর্মে রংএর বুনন তীক্ষè, গভীর ও মর্মস্পর্শী। কম্পজিশন, ড্রইং, জোড়ালো এবং কাগজের মাঝখানটায় উপর-নীচ জুড়ে জ্যামোতিক ফর্মে স্পেস ছাড়ার কায়দাটি চমৎকার। ঘন রং-এর জমিনটি কিউবিজম ঘরনার কয়েকটি চর্তুভুজ দ্বারা বিভক্ত থাকায় চোখ কোথাও লেপ্টে থাকে না, কাগজের সবকয়টি স্থানিক বিন্দুতে ঘোরতে থাকে- এখানেই শাহ আলমের অনন্যতা। ৫৪ নং শিল্পকর্মে ব্রাশিং- এর দুরন্ত গতি এবং একই মুখাবয়ে নারীপুরুষের অভিব্যক্তির বিচ্ছুরণ নিয়ে বৃত্তাবদ্ধ নরনারী জলরংটি অপূর্ব, অনন্য। এযেন শাহাবুদ্দিনের গতিশীলতাকেও অতিক্রম করে যায়। বৃক্ষের আড়ালে দু‘টি প্রতিবাদমুখর  নর-নারী তারুণ্যের উচ্ছাসে উদ্বেলিত। শাহ্ আলমের জলরং জগতের অন্যতম শ্রেষ্ট কাজ বৃত্তাবদ্ধ নর-নারী। এ সিরিজের সবচেয়ে প্রাজ্ঞ ও হার্দিক চৈতন্যের জলরং ‘প্রাচীর’ শিল্পকর্মটি। এ জলরং-এ আমরা  কৈশোর কালের শাহ আলমকে পাইনা, পাই বিজ্ঞানমনষ্ক, স্থিরপ্রাজ্ঞ একজন শাহ্ আলমকে। আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় প্রাচীর জলরংটি শাহ্ আলমের শ্রেষ্টতম জলরং। বিষয়বস্ত নির্বাচনে, রং-রেখার কম্পজিশনে, ড্রইং-এর গতিশীল ছন্দে এ জলরংটি সমাজের অন্ধকার বিবরে যেভাবে আলো ফেলেছে তার তুলনা কোথায়? এবার দৃষ্টি ফেরাব পট্রেট চিত্রকর্মের বিশ্লেষণে। পূর্বেই উল্লেখ করছি শাহ্ আলম পট্রেট অংকনে সিদ্ধহস্ত। শাহ্ আলমের পট্রেটের সবচেয়ে বিশেষত্ব হচ্ছে ব্যক্তির চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব পট্রেটে ফুটিয়ে তোলার দক্ষতা। এমনটি আমরা উপমহাদেশের স্বল্প সংখ্যক শিল্পির মধ্যে দেখতে পাই। শাহ্ আলমের পট্রেটে কম্পজিশনে পূবসূরীদের থেকে আলাদা আঙ্গিকের নতুনত্ব রয়েছে। কাগজ বা ক্যানভাসের প্রায় পুরো স্পেস জুড়েই শাহ্ আলমের পট্রেটের ড্রইং সাজানো থাকে। জলরং মাধ্যমের আাঁকা ৫৮ নং পট্রেটটি সিলেটের বাউল শাহ আব্দুল করিমের পট্রেট। দেখুন পট্রেটে গ্রামীন সরলতা এবং চরিত্রের  পরিচ্ছন্নতা কতো চমমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে। এখানে বাউল করিমকে আমরা পাই একজন কোমলপ্রাণ, স্থিতজ্ঞ পুরুষ এবং লোকজ ঘরনার একজন কর্মবীর হিসেবে। ৫৯ নং পট্রেটে কি নজরুলের তারুণ্যের উচ্ছাস এবং ইস্পাত দৃঢ় চরিত্রের অবয়ব খুঁজে পাই না? ৬২ নং পট্রেটে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদকে যে স্বরূপে দেখতে পাই তাতে কি আর লেখনীর মাধ্যমে সামাদ আজাদের ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞার বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন আছে? অধিকাংশ শিল্পিরা তৈলরং-এর মাধ্যমে পট্রেট এঁকে থাকেন কেননা জলরং-এ পট্রেটের ইমেজ ফুটিয়ে তোলা যে কতো  দূরূহ এবং অনিশ্চয়তাপূর্ণ তা শিল্পি মাত্রই অবগত আছেন। শাহ্ আলম সেই দুরূহ কাজটি কতো স্বত:স্ফূর্ত এবং সাবলীলভাবে করতে পারে ভাবলে অবাক লাগে। শাহ্ আলমের জীবনের শেষ শিল্পকর্ম হলো কবি নজরুলের শেষ জীবনের পট্রেট যার শিরোনাম ছিলো সায়াহ্নে নজরুল। সংখ্যা বিবেচনায় অত্যাধিক না হলেও শাহ্ আলমের তৈলরং ইস্পাতদৃঢ় আঙ্গিকের পরিকাঠামোর শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ল্যান্ডস্কেপ কিংবা ফিগারেটিভ যাই হোক না কেন শাহ্ অলমের অধিকাংশ তৈলরংই রিয়েল্যাস্ট্রিক নয় ফর্মভিত্তিক অথবা আধাফর্ম ভিত্তিক দ্বিমাত্রিক ডাইমেশনে সৃষ্টি। এতে কিউবিজম, স্যুরেলিজম, ইমপ্রেসনিজমের প্রভাব অবশ্যই রয়েছে এমন কি বিতর্কিত এবষ্ট্রাক্ট এক্সপেসনিজমেরও প্রভাব বলয়ের বাইরে নয়। এবষ্ট্রাক্ট এক্সপেসনিজমের টোন ভ্যারিয়েশন, স্টেকচার এবং কোমল রং-এর টেকনিকটিই শাহ্ আলম গ্রহন করেছে, আদর্শ নয়। যে কোন ইমেজের কাঠামোগত বিন্যাসের নিয়ন্ত্রনঘেষা হউক না কেন শাহ্ আলমের তৈলরং ফিগারধর্মী। শাহ্ আলমের তৈলরং-এ একটিও ফিগারবিহীন শিল্পকর্ম খুঁজে পাওয়া যাবেনা। প্রথমে উর্বশী শিরোনামের তৈলরং ভিত্তিক শিল্পকর্মটি নিয়ে আলোচনা করব। প্রথম দৃষ্টিতে  শিল্পি কিবরিয়ার শিল্পকর্মের মতো এটি এবষ্ট্রাক্ট ঘরনার শিল্পকর্ম বলে ভূল হতে পারে, (চিত্র নং ১৫ক:)। মুলতঃ এটি একটি ফিগারেটিভধর্মী তৈলরং। এ ছবিতে আলো-আঁধারীর চতুরতা  আছে। কিছু বলা আর না বলার মাঝখানটায় রয়েছে নিপুন শিল্পকর্মের সূঁচী সৌন্দর্য্য। ছবিতে বাম দিকের নিচের অংশে পাঞ্জাবী পরিহিত একজন পুরুষের ছবি পেছন সাইড থেকে দৃষ্টিগোচর হয়। উপর হতে ক্যানভাসের মধ্যাংশ জুড়ে সেলাই করা একটি পাঞ্জাবী ঝুলে আছে। পাঞ্জাবীর পিছনে অন্ধকার অংশে অস্পষ্টভাবে উৎকন্ঠিত উর্বশীর মুখাবয় সামনাসামনিভাবে অংকিত রয়েছে। ঠোঁট দুটি কাপড় দিয়ে বাঁধা। দ্বিমাত্রিক ফর্মে অংকিত তৈলরংটি কি দিক নির্দেশনা দিচ্ছে? শিল্পের গুঢ় রহস্য যারা বুঝেন তারা বুঝবেন তার মাহাত্ত্ব্য। জীবন জীবনের জন্য কিন্তু বাস্তবতা বড় রুঢ় ও নির্মম।  শিল্পচৈতন্য প্রকাশভঙ্গিমায় অনন্য ৬৫ নং তৈলচিত্রটি। দ্বিমাত্রিক ফর্মে অংকিত বাসন্তিকা শিরোনামের তৈলচিত্র। এখানে আমরা পিকাসোর গোয়ের্নিকা চিত্রকর্মের নির্মাণকৌশল প্রত্যক্ষ করি। পিকাসোর গোয়ের্নিকা ইস্পাত কঠিন প্রতিবাদ নিয়ে যেভাবে গর্জে উঠে শাহ্ আলমের চিত্রকর্মে তেমন ভাবটি নেই। শাহ্ আলমের ভাষা এখানে বিনীত, মার্জিত, নিবেদনের ভঙ্গিতে প্রকাশিত। মানুষের শুভবুদ্ধির উপর শাহ্ আলমের আস্থা অপরিসীম। তাই ছবিতে আবেদন-নিবেদন আছে দাবানল নেই। ছবির কম্পজিশনে বৃত্ত এবং অর্ধবৃত্তের ছড়াছড়ি রয়েছে, ত্রিভূজ বা চতুর্ভূজ নেই। শুধুমাত্র বৃত্তিয় ফর্মে অংকিত স্বল্পসংখ্যক কাজের মধ্যে এটি একটি। ছবিতে আবেগ ও গতির সমন্বয় এবং সংযম লক্ষণীয়। জীবন-১ তৈলচিত্রে শাহ্ আলম চোখের মনিকে ক্যাসেটের গোল চাকতির সঙ্গে তুলনা করেছে। সেই ক্যাসেটের বিচ্ছরিত আলোর মাধ্যমে অনেকেই উত্থান ও পতনের চলমান দৃশ্যাবলী অবলোকন করেন-এই হলো ছবির মূল সুর ও ছন্দ। চমৎকার বক্তব্যের এ তৈলরংটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় দ্বি-বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে স্থান পায়। নন্দিতা শিরোনামের তৈলচিত্রটি শাহ্ আলমের স্বাপ্নিক কাব্য সিরিজের একটি উল্লেখযোগ্য তৈলচিত্র। সমাজ দর্পনে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা একজন তরুনীর হৃদয়  আর্তির কাহিনীর কথা তৈলরং-এ রূপদান করা হয়েছে। রং ব্যবহারে শাহ্ আলম এখানে বিশ^খ্যাত ডেনিস চিত্রশিল্পি ভ্যান গগের রং ব্যবহারের স্টাইলের অনুকরণীয় প্রয়োগ নৈপুন্য বেশ দক্ষতার সঙ্গে দেখাতে পেরেছে। সুমিত্র শিরোনামের তৈলচিত্রটিতে আমরা ইন্দোনেশিয়ার প্রখ্যাত শিল্পি বাগংকুফুদিয়ারদিয়োর স্টাইল ও টেকনিকের অনুকরণ লক্ষ্য করি (চিত্র নং১৩ ক)। প্রতীকধর্মী এ চিত্রকর্মটি ফর্ম ভাঙ্গার এক ভিন্নতর মাত্রা ও বৈভবে অভিষিক্ত। শাহ্ আলমের অন্যতম শ্রেষ্ট তৈলচিত্র হলো জীবন-২ নামের শিল্পকর্মটি। গ্রাম-বাংলায় খেটে খাওয়া মানুষদের অবস্থা হলো সার্কাস পার্টির ভাঁড়দের মতো,  যারা অন্যদের হাঁসায় কিন্তু নিজের জীবনের কোথাও হাঁসি নেই শুধু আছে নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ-বেদনার করুন ইতিহাস। চিত্রের ফিগারের মুখাবয়ে উজ্জল লাল  ও হলুদ রং এর ব্যবহার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ক্যানভাসের মানুষগুলি অনেক বেশী সতর্ক ও ক্রোধী। তীরের ফলার মতো গোঁফদ্বয় প্রমাণ করে যে জীবনযুদ্ধে পরাজিত এইসব মানুষেরা গোঁফের আড়ালে কৃত্রিম বীরত্বকে জাহির করতে চায়। সাপের গলার মতো লম্বা গ্রীবা মাকড়ের জালের আড়ালে আত্মগোপন করে আছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে নীলরং এর আধিক্য স্মরণ করিয়ে দেয় এইসব মানুয়েরা এখনও পূর্ণাঙ্গ যান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারেনি। ধূসর রোমান্টিক জগতের ফেনিল আবর্তে এখনও তারা আবর্তিত। ছবিটিতে কম্পজিশনের ভঙ্গিটি জয়নূল স্টাইলে নেয়া। ছবিটির ফর্ম পুরোপুরি দ্বিমাত্রিক নয় ত্রিমাত্রিকতার একটা রেশ চিত্রে রয়েই গেছে। সবকিছু মিলিয়েই এ সিরিজের সবচেয়ে শ্রেষ্ট তৈলরং হচ্ছে চন্দ্রাহত শিরোনামের তৈলচিত্রটি। স্টেকচার, টোনাল ভেরিয়েশন এবং চৈতন্যের এক স্বপ্নীল কারুকাজ ছবিটিকে ভিন্নমাত্রা দান করে। রাতের শেষ প্রহরের বিনিদ্র চাঁদের অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে ত্রিভূজ আকৃতির বোল্ড ব্রাশিং-এর একটি ফর্ম। এ যেন চাঁদের কলঙ্ক। সেই কলঙ্কের গা’বেয়ে বৃষ্টির ফোটার মতো ঝরছে নির্জন অশ্রæ। অন্ধকার তিমির বলয়ে অবস্থিত একটিমাত্র বিস্ফোরিত চোখ সে দৃশ্য দেখছে। শুধুমাত্র বর্ণনায় তরজমায় এর রহস্য ভেদ করা সম্ভব নয়। এ ধরণের ছবির গভীরতা ও মর্মবাণী বুঝতে হলে চাই তৃতীয় নয়ন। হার্দিক চৈতন্য নিয়েই এসব ছবি বুঝে নিতে হয়। চোখ এখানে দুতিয়ালীর কাজ করে মাত্র। প্রকৃতি এখানে ধীর, স্থির, অনন্ত কাব্যময় প্রবাহের ভাবাবেগে অনুরনিত।

শাহ্ আলমের মিশ্র মাধ্যমের শিল্পকর্মগুলি জলরং ও তৈলরং মাধ্যমের মতো আমাদের এতোটা উদ্ধেলিত করে না সত্যি তবুও তার মধ্যেও রয়েছে অনন্ত সত্যের কিছু মৌলিক উপাদান। ৭২, ৭৩, ৭৪, ৭৫ নং চিত্রগুলি মিশ্রমাধ্যমে আঁকা। নিমগ্ন শিরোনামের ৭২ নং মিশ্রমাধ্যমটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। শাহ্ আলম ভাস্কর্যের উপরও কিছু কিছু কাজ করেছে। তেমনি রয়েছে প্যাষ্ট্রালরং ও প্রচ্ছদ ডিজাইনের সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম। শাহ্ আলমের প্যাষ্ট্রালধর্মী শিল্পচর্চা নিয়ে এখানে কোন আলোচনা করবো না যেহেতু চোখের সামনে তাঁর প্যাষ্ট্রালের কোন কাজ নেই। স্মৃতির সাহায্যে শুধুমাত্র একথাই বলতে পারি শাহ্ আলমের প্যাষ্ট্রাল চিত্রকর্মে শিল্পি সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও সুধীর মিত্রের প্রভাব রয়েছে বলে মনে হয়। নেহায়েত কমার্শিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শাহ্ আলম কোন প্রচ্ছদ আঁকেনি। শুরুতেই বলেছিলাম শাহ্ আলমের পূর্ণাঙ্গ একটি শৈল্পিক চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করবো। জানিনা শাহ্ আলমের পট্রেট আমি কতটুকু আঁকতে পেরেছি। বিচারের ভার পাঠকবৃন্দের নিকট সমর্পন করলাম।

সামগ্রিকভাবে শাহ্ আলমের শিল্পকর্ম বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি একটি অস্থিরতা সমগ্র শিল্পকর্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনে হয় সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলি হারিয়ে যাচ্ছে, বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন? ক্ষণজন্মা শাহ্ আলম কি বুঝতে পেরেছিলো তাঁর আয়ূকালের পরিধি সামান্য, সীমিত? শাহ্ আলম সমাজকে দিয়েছে অনেককিছু, নিয়েছে খুবই কম। শাহ আলম সিলেটের মা-মাটি-মানুষকে ভালোবেসেছিলো। চেয়েছিলো সিলেটের আঞ্চলিক শিল্পকলার পরিধিকে বিশ্ব মানদন্ডের কাতারে নিয়ে যেতে। নিত্যদিন আমরা তার প্রতি অবিচার করেছি। বাপ-দাদার জীর্ণ পুরাতন ভাঙ্গা টিনের সুটকেসগুলি কতবার তাকে দিয়ে রং করিয়েছি। এতে আমাদের চৈতন্যের দৈন্যতাই প্রকট হয়ে উঠেছে। শাহ্ আলমের কত কষ্ট। সেতো ছিলো আমাদেরই লোক। আসুন আমরা শাহ্ আলমকে ভালোবাসতে শিখি। শান্তিতে ঘুমাক শাহ্ আলম। শাহ্ আলমকে ভালোবেসে আমরা কেউ কখন দেউলিয়া হবোনা, আমরা সমৃদ্ধ হবো। 

‘ আমৃত্যু দুঃখের তপস্যা এ জীবন/ সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করিবারে/ মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ করে দিতে।’

 

অরবিন্দ দাসগুপ্ত

চিত্রশিল্পী,  শাহ আলমের শিক্ষক